শিরুপন বড়ুয়া
১ম সংখ্যার পর… ৬৩৮-৩৯ খিষ্টাব্দে পুণ্ড্রবর্ধন ভ্রমণের সময় হিউয়েন সাঙ বিশটির মতো সংঘারাম দেখেছিলেন এবং এখানে তিনি তিন হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে মহাযান ও হীনযান দু’য়েরই চর্চা দেখতে পান। তাঁর বর্ণনা মতে, পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুণ্ড্রনগরী হতে বিশ কিলো দূরে পো-সি-পো সংঘারাম অবস্থিত। সংঘারামটির চূড়া বেশ উঁচু এবং আঙ্গিনাটি বিশাল। সংঘারামের প্রায় সাতশত ভিক্ষু মহাযান ধারা চর্চা করেন। এই সংঘারামের কাছেই হিউয়েন সাঙ সম্রাট অশোকের তৈরি একটি স্তূপ দেখেছিলেন। স্যার কানিংহাম হিউয়েন সাঙ-এর দেখা সেই পো-সি-পো সংঘারামটিকে ভাসু বিহার বলে শনাক্ত করেছেন ।
স্যার কানিংহাম যখন মহাস্থানগড়ে আসেন, তখনো হিউয়েন সাং-এর দেখা স্তূপটির উচ্চতা ত্রিশ ফিট ছিল বলে তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেন। এটিই হয়ত সেই স্তূপ যা মৌর্য সম্রাট অশোক নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়াও বাংলার কর্ণসুবর্ণে হিউয়েন সাঙ দশটি বৌদ্ধ বিহার দেখতে পান। সমতটে আসার পর তিনি দুই হাজার বৌদ্ধভিক্ষুসহ অন্তত ৩০টির মতো সংঘারাম দেখতে পান। এর রাজধানীর কাছে তিনি সম্রাট অশোক নির্মিত একটি বৌদ্ধ স্তূপ দেখতে পেয়েছিলেন। যতীন্দ্র মোহন রায় ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে ধামরাই-কে ‘ধর্মরাজিকা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলা নামটি ‘ধর্মরাজিকা’ হতে এসেছে, যা ছিল হিউয়েন সাং-এর দেখা অশোক নির্মিত সেই স্তূপ। উল্লেখ্য যে, অশোক নির্মিত বেশ কিছু বৌদ্ধ স্তুপকে ‘ধর্মরাজিকা’ বলা হয়।
তাম্রলিপ্তিতে হিউয়েন সাঙ দশটি বৌদ্ধ বিহার এবং একটি বৌদ্ধ স্তূপ বা চৈত্য দেখেছিলেন। দুই শত বছর পূর্বে ফা হিয়েন তাম্রলিপ্তিতে বাইশটি বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন। ইৎ সিঙ এখানে পাঁচ থেকে ছয়টি বৌদ্ধ বিহার দেখতে পেয়েছিলেন। ফা হিয়েন থেকে ইৎ সিঙ পর্যন্ত ভ্রমণ বৃত্তান্তগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাম্রলিপ্তিতে বৌদ্ধ বিহারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছিল। অথচ একই সময়ে বাংলার সমতট জনপদে বৌদ্ধ বিহারের সংখ্যা বেড়েই চলছিল। হিউয়েন সাঙ, ইৎ সিঙ, এবং শেঙ চি’র সমতট ভ্রমণ বৃত্তান্ত পড়ার পর অন্তত সেটাই মনে হয়। হতে পারে পালবংশের উত্থান পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার (বঙ্গ-সমতট) শাসকগণের পৃষ্ঠপোষকতায় এটা সম্ভব হয়েছিল। তাই বলা যায়, একটা সময় পর তাম্রলিপ্তিতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ক্ষীণ হতে থাকে। তবে একই সময়ে বাংলার অন্য একটি জনপদ সমতটে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বাড়তে থাকে।
১ম সংখ্যা পড়ুন
এলাহাবাদে আবিষ্কৃত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের স্তম্ভলিপিতে সমতট-এর নাম উল্লেখ আছে। ৫০৭-৫০৮ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই সমতট অঞ্চল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের মেঘনা পূর্ববর্তী এলাকায় কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চল নিয়েই ছিল সমতট। কুমিল্লার গুনাইঘরে প্রাপ্ত গুপ্ত সম্রাট বৈন্যগুপ্তের একটি তাম্রশাসন হতে এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। ঐ তাম্রশাসনে সম্রাট বৈন্যগুপ্ত ‘বৈবার্তিকা’ নামের মহাযানী ভিক্ষু সংঘকে ভূমি দান করছেন বলে উল্লেখ আছে। আচার্য শান্তিদেব ছিলেন ঐ ভিক্ষু সংঘের প্রতিষ্ঠাতা। তাম্রশাসনটিতে আরো উল্লেখ আছে, এই ভূমিতে যে বিহারটি নির্মাণ করা হবে তা বোধিস্বত্ব অবলোকিতেশরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। ঐ তাম্রশাসনে বৌদ্ধ আচার্য শান্তিদেব ছাড়াও জীৎসেন নামের আরো একজন বৌদ্ধ আচার্যের নাম পাওয়া যায়। তাছাড়া মহারাজা রুদ্র দত্ত ও বিজয়সেন নামের দুইজন সামন্তরাজার নামও উল্লেখ আছে তাম্রশাসনটিতে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধ সভ্যতার যে-সব নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান শাখার ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। পাল শাসনামলের আগেই বাংলার জনপদগুলোতে বৌদ্ধ ধর্মের মহাযানী সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পালবংশের রাজত্বের পূর্বেও বাংলাদেশে বৌদ্ধ মহাবিহার ছিল। এসব মহাবিহারগুলোর বর্ণনা হিউয়েন সাঙ, ইৎসিঙ ও শেঙ চি’র ভ্রমণ বৃত্তান্ত হতে জানা যায়। গুপ্ত যুগে নির্মিত বিখ্যাত নালন্দা মহাবিহারের সমসাময়িক ধরা হয় কুমিল্লার ময়নামতিকে। গুপ্ত সম্রাটগণ ছিলেন পরম বৈষ্ণব ভগবত। এই বংশের রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী না হলেও এই ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ফলে গুপ্ত যুগেও ভারতবর্ষের বিভিন্ন জনপদে বৌদ্ধ স্থাপনার নির্মাণ চলতে থাকে, এবং বলা যায়, বৌদ্ধ ধর্ম তার স্বাভাবিক গতিতে ক্রিয়াশীল ছিল। বিখ্যাত বৌদ্ধপণ্ডিত বসুবন্ধু ছিলেন গুপ্ত বংশের রাজকুমার বালাদিত্যের শিক্ষক। ভারতবর্ষে হিউয়েন সাঙ-এর অবস্থানকালে সমতট দেশের রাজপুত্র মহামতি শীলভদ্র নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আচার্য ছিলেন।
চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী শেঙ চি সমতটে আসেন সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। সেময় সমতটের শাসক ছিলেন রাজভট্ট, যিনি সম্ভবত মহাযানী ছিলেন। এই রাজভট্ট খড়গ রাজবংশের রাজারাজভট্ট নামেও পরিচিত। শেঙ চি’র দেখা সমতট হিউয়েন সাং এর সমতট এর চেয়ে বহুগুণে মহাযানী বৌদ্ধ সভ্যতায় সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতিতে উৎখননের ফলে বিভিন্ন ধরনের বৌদ্ধ চৈত্য, বিহার, ও মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে যা খড়গ, দেব, এবং চন্দ্র বংশের মতো রাজবংশগুলোর রাজত্বকালের ঐতিহ্য বহন করে। এই অঞ্চলে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ সভ্যতার উল্লেখযোগ্য প্রত্নস্থানগুলো হচ্ছে ইটখোলা মুড়া, রূপবান মুড়া, কুটিলা মুড়া, আনন্দ বিহার, শালবন বিহার (এখানে প্রাপ্ত মাটির টেরাকোটার সীল মতে শালবন বিহারের আসল নাম- শ্রী ভবদেব মহাবিহার আর্য ভিক্ষু সংঘ), লতিকোট মুড়া, ভোজ বিহার, রানি ময়নামতির প্রাসাদ।
শালবন বিহারে প্রাপ্ত পোড়ামাটির সিল এবং তাম্রলিপি হতে জানা যায় দেব বংশের তৃতীয় শাসক শ্রী আনন্দদেব ও তাঁর পুত্র শ্রী ভবদেব শালবন বিহার নির্মাণ করেছিলেন। কুমিল্লার শালবন বিহার নওগাঁর সোমপুর (পাহাড়পুর) মহাবিহারের তুলনায় ছোট, তবে এর নির্মাণ কৌশল শেষোক্ত বিহারের মতোই। সম্ভবত শালবন বিহারকে অনুকরণ করে সোমপুর বিহার নির্মিত হয় পাল যুগে। শালবন বিহারে ছয়টি নির্মাণ যুগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। বিভিন্ন নির্মাণযুগে প্রাপ্ত অন্তত আটটি তাম্রলিপি হতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিভিন্ন রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গিয়েছে। এসব তাম্রলিপির মধ্যে বৈন্যগুপ্তের তাম্রলিপি, দেবখড়গের তাম্রলিপি, বলভট্ট তাম্রলিপি, আনন্দদেবের তাম্রশাসন, ভবদেবের তাম্রলিপি, এবং দেববংশীয় তাম্রলিপি উল্লেখযোগ্য।
কিছু কিছু তাম্রলিপিতে মরিচা পড়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়াতে সেগুলোর পঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তারপরও এসব লিপি হতে বিহারের জন্য ভূমি দান এবং বিশেষ করে, বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ অর্থাৎ ত্রিরত্নের নামে বিহারিকা প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি দান সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। শালবন বিহার প্রাঙ্গণে যেমন নিবেদন স্তূপ পাওয়া গিয়েছে তেমনি বিভিন্ন বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তিও পাওয়া গিয়েছে। বুদ্ধ মূর্তির পাশাপাশি বোধিসত্ত্ব, তারা, সার্বণী, প্রজ্ঞাপারমিতা’র মতো মহাযানী দেবদেবীর মূর্তি উৎখননে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই মূর্তিগুলো সমতট এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তনের সাক্ষী। বাংলার বৌদ্ধ ধর্ম কীভাবে মহাযান, হীনযান থেকে তন্ত্রযান এবং আরো পরে হিন্দু ধর্মের মাঝে বিলুপ্ত হয়েছে তার ঐতিহাসিক সাক্ষী হচ্ছে এসব মূর্তি।
শালবন বিহারের মতো আনন্দ বিহারেও পাওয়া গিয়েছে ব্রোঞ্জনির্মিত ভোটিভ স্তুপ, টেরাকোটা সিল, তাম্রলিপি, বুদ্ধ মূর্তি সহ বোধিসত্ত্ব, এবং আট হাতবিশিষ্ট তারার মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এই বিহারে প্রাপ্ত ধ্যনী বুদ্ধ মূর্তি শালবন বিহারে প্রাপ্ত মূর্তির চেয়ে উন্নত মানের। ব্রোঞ্জ নির্মিত খুব সুন্দর একটি বজ্রসত্ত্ব মূর্তি পাওয়া গিয়েছে ভোজ বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভেতরে। এটি বেশ ভালো অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। আমেরিকার ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মিসেস হানটিংটন মূর্তিটিকে অষ্টম শতাব্দীর বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ইতিহাসবিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া এটাকে অষ্টম শতাব্দীর বলে মানতে নারাজ। তাঁর মতে এটি দশম শতাব্দীর পূর্বে এবং অষ্টম শতাব্দীতে কিছুতেই হতে পারে না। এই মূর্তিটি বজ্রযানে ধারার। বাংলার বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান কালাক্রমে বিবর্তন হয়ে তন্ত্রযান, বজ্রযান, সহজযানে পরিণত হয়, মূর্তিটি তারই প্রমাণ।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে যেক’টি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তারমধ্যে নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশর অন্যতম। বলা হচ্ছে এটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম মানব সভ্যতার প্রমাণ। উয়ারী-বটেশরে ধর্মীয় প্রকৃতি কি ধরনের ছিল, তা এখনো বিস্তারিত জানা না গেলেও, এই এলাকার প্রত্নস্থানে আবিষ্কৃত নব্ যুক্ত মৃৎপাত্র বৌদ্ধ সভ্যতার ইঙ্গিত বহন করে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রমতে সমতট জনপদের যে অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে উয়ারী-বটেশর সেই সীমানার মধ্যেই অবস্থিত। তাই এই অঞ্চল সমতট জনপদের অংশ ছিল বলা যায়। এলাহাবাদে আবিষ্কৃত সমুদ্রগুপ্তের স্তম্ভ লিপিতে সমতট এর নাম উল্লেখ আছে সেটা আগেই উল্লেখ করেছি। সম্প্রতি উয়ারী-বটেশরের বিভিন্ন প্রত্নস্থান খননের মাধ্যমে উন্মোচিত হওয়ার ফলে এই এলাকাটিই এলাহাবাদ প্রশস্তি’তে উল্লিখিত আদি সমতট বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদগণ। কারণ উয়ারী-বটেশরের প্রাচীনত্ব লালমাই-ময়নামতির চেয়েও প্রাচীন, যা খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের এলাহাবাদ লিপির সাথে মিলে যায়। অথচ লালমাই-ময়নামতির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো কোনোভাবেই খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের পূর্বের নয়। সে হিসেবে উয়ারী-বটেশরই প্রাচীন সমৃদ্ধ সমতট জনপদ। বৌদ্ধ পদ্ম-মন্দির বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন, যা আবিস্কৃত হয়েছে উয়ারী-বটেশর হতে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। এটি সপ্তম-অষ্টম শতকের বলে ধারণা করা হয়। এছাড়াও দশ কিলোমিটার দক্ষিণে জানখাঁরটেকে আবিষ্কৃত হয়েছে একটি বিহারিকা। এই স্থাপনার দুই কিলোমিটার দক্ষিণে টঙ্গীরটেকে আবিস্কৃত অন্য একটি স্থাপনাকে বলা হচ্ছে বৌদ্ধ মন্দির। এসব আবিষ্কার উয়ারী-বটেশর এর মতো প্রাচীন জনবসতিতে বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার সাক্ষ্য বহন করছে।
পরবর্তী সংখ্যা পেতে চোখ রাখুন….. চলমান