বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদে বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য । ১ম সংখ্যা

buddhist history

শিরুপন বড়ুয়া

১৯৭১ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে অতীতকালে গৌতম বুদ্ধ সশরীরে ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন কিনা তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে আসা বেশ কঠিন। যেহেতু নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি, তাই ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, গৌতম বুদ্ধ এ দেশে পা রাখেননি। তবে হয়তো গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় অথবা তাঁর মহাপরিনির্বাণের অল্পকাল পরেই এ দেশে বৌদ্ধ ধর্মের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে বাংলাতে সমসাময়িক ধর্ম হিসেবে জৈন ধর্মের প্রভাব শুরুর দিকে বৌদ্ধ ধর্মের চেয়ে বেশি ছিল বলেই মনে হয়। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যাবে।

নেপালে আবিষ্কৃত তালপাতায় লেখা সংস্কৃত ভাষার বৌদ্ধ সাহিত্য ‘সুমাগধা অবদানা’ (অবদানা-শতকা) কাহিনী থেকে জানা যায়, শ্রাবস্তির দাতাশ্রেষ্ঠ অনাথপিন্ডিক তাঁর মেয়ে সুমাগধা’র বিয়ে দিয়েছিলেন পুন্ড্রবর্ধনের সুশিলা নামক এক ধনীর সন্তান বৃষভ দত্তের সাথে। অনাথপিন্ডিক গৌতম বুদ্ধের অনুসারী হলেও তাঁর কন্যা সুমাগধা’র শ্বশুর বাড়ির লোকজন ছিল জৈন ধর্মের অনুসারী। কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ সুমাগধা’র নিমন্ত্রণে পুন্ড্রবর্ধনে এসেছিলেন এবং বুদ্ধের ধর্মকথা শুনে সুমাগধার পরিবারের সবাই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এই কাহিনীর সত্যতা কতটুকু তা নির্ণয় করা কঠিন হলেও, হিউনে সাঙ-এর বর্ণনায় পুণ্ড্রবর্ধনে জৈন ধর্মের অনুসারীদের উপস্থিতির কথা জানা যায়। তা ছাড়া ‘শ্রবণ বেলগোলা’ লিপিমতে জৈন ধর্মের বিখ্যাত সন্ন্যাসী ও মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আধ্যাত্মিক গুরু ভদ্রবাহু জন্মেছিলেন এই পুণ্ড্রবর্ধনে।

ভারতের মধ্যপ্রদেশে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোক কর্তৃক নির্মিত সাঁচী বৌদ্ধ স্তূপের দক্ষিণ তোরণের দুটি লিপি হতে জানা যায়, উক্ত তোরণটি ধর্মদত্ত ও রিশিনন্দন এর আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হয়, যাঁরা ছিলেন পুণ্ড্রনগরের বাসিন্দা। পুণ্ড্রনগরে বৌদ্ধ ধর্মের অনুশীলন না হয়ে থাকলে সদ্ধর্মপ্রীতি ও দানচিত্তের উদয় হওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাসবিদগণ পুণ্ড্রনগরকে পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের আরো একটি লিপি আবিষ্কৃত হয় ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের নাগা অর্জুনকুন্ডে। ঐ লিপিতে উল্লেখ আছে, বঙ্গ হচ্ছে হীনযান বৌদ্ধ সংঘের প্রধান কেন্দ্র। এই তিনটি লিপি হতে প্রাচীন ভারতের দুটি জনপদ অর্থাৎ পণ্ড্র্র ও বঙ্গে বৌদ্ধদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রাচীন ভারতের জনপদগুলো হচ্ছে মৌর্য সাম্রাজ্যপূর্ব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এরকম ষোলোটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদের নাম পাওয়া যায় জৈন সাহিত্যের ভগবত সূত্রে ও বৌদ্ধ সাহিত্যের অঙ্গুত্তর নিকায়-তে। এছাড়াও বৈদিক সাহিত্য, রামায়ণ ও মহাভারতেও প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও বৌদ্ধ সাহিত্যে সরাসরি বঙ্গ ও পুণ্ড্রের নাম পাওয়া যায় না, কিন্তু জৈন সাহিত্যে এই দুটি জনপদের নাম উল্লেখ আছে। তবে গৌতম বুদ্ধ বাংলার প্রাচীন জনপদ বঙ্গ ও পুণ্ড্রবর্ধন সম্পর্কে বেশ অবগত ছিলেন বলে বৌদ্ধ সাহিত্য হতে জানা যায়।

খুদ্দক নিকায় এর ‘অপাদানায়’ বাঙ্গিসা নামক এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর কথা জানা যায়। এই বৌদ্ধ ভিক্ষু জন্মেছিলেন বঙ্গ জনপদে, তাই তাঁর নাম হয়েছিল বাঙ্গিসা। কবিতা রচনায় বাঙ্গিসা বেশ পারদর্শী ছিলেন, এবং স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ তাঁর কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। শ্রাবস্তির জেতবন বিহারে বারোশত পঞ্চাশ জন শিষ্যের উপস্থিতিতে বুদ্ধের সাথে ভিক্ষু বাঙ্গিসার কথোপকথন ‘পারোহাস্স সূত্তে’ বর্ণিত আছে। এটি সূত্ত পিটকের সামুত্তা নিকায়ের অন্তর্ভুক্ত। অঙ্গুত্তর নিকায়-তে উপসেনা নামে এক ভিক্ষুর উল্লেখ পাওয়া যায় যাঁকে ‘বংগান্তপুত্ত’ বলা হতো। তিনি হয়তো বঙ্গের সন্তান ছিলেন। এছাড়া বৌদ্ধ সাহিত্য ‘দিব্যবদান’ -এ ভিক্ষু উপালির একটি প্রশ্নের উত্তরে গৌতম বুদ্ধ পুন্ড্রবর্ধন জনপদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ‘ঐতেরিয় আরণ্যক’ গ্রন্থে ‘বঙ্গভগধা’ শব্দটি মগধ ও বঙ্গ শব্দের যুক্তাক্ষর বলে মনে করেন কিছু ইতিহাসবিদ। বঙ্গ ও মগধ এর যৌথ উল্লেখ এই দুটি জনপদের ভৌগোলিক নৈকট্যের দিকেই ইঙ্গিত দেয়, এবং মগধ যে গৌতম বুদ্ধের সমকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই মগধ হতে বঙ্গ ও পুণ্ড্রনগরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার হওয়া তাই অসম্ভব কিছু নয়। হয়ত সেটা ছিল মাত্র শুরু, কিন্তু এরপর মৌর্য সম্রাট অশোকের আমলে নিশ্চিতভাবেই বর্তমান বাংলাদেশের একটি বড়ো অংশে এবং পশ্চিমবঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম অন্যতম একটি শক্তিশালী ধর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের সর্বত্র এই ধর্মটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। আর তাই, এ দেশের মাটির নিচ হতে উন্মোচিত হওয়া বেশিরভাগ প্রত্নতাত্ত্বিক অবকাঠামোর লাল ইটের সাথে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। আর এই ঐতিহ্যের ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে, এদেশের মাটি দু’হাত খুঁড়লেই আমরা অসংখ্য বুদ্ধমূর্তি সহ বৌদ্ধ স্থাপনার চিহ্ন খুঁজে পাই।

যে পুণ্ড্র জনপদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেই জনপদটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বানগড় এবং বাংলাদেশের বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল, যার কেন্দ্র ছিল পুণ্ড্র নগর বা বগুড়ার মহাস্থানগড়। বগুড়া শহর থেকে তেরো কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ অবস্থিত, এবং এটাই মহাস্থানগড়। এখানে একটি শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে যা মৌর্য সম্রাট অশোকের আমলের বলে মত দিয়েছেন পণ্ডিত মহল। উক্ত শিলালিপিতে পুন্দলগলের (পুণ্ড্রনগরের) প্রাদেশিক শাসককে প্রজাদের সাহায্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্য চালানোর ফলে যে-সব প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের এই অঞ্চলে মৌর্য শাসনের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
অতীতকালে বিভিন্ন যুগে ভারতবর্ষে বৌদ্ধ দর্শন অধ্যয়ন করতে আসা ফা হিয়েন, হিউয়েন সাঙ,ইৎ সিঙ, এবং সেঙ চি’র মতো চীন দেশের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও তীর্থযাত্রীদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত হতে তৎকালীন বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের অবস্থা কেমন ছিল তা জানা যায়।

পঞ্চম শতাব্দীতে চন্দ্রগুপ্ত দ্বিতীয়-এর শাসনামলে চীন থেকে ভারতে আসেন ফা হিয়েন, এবং ছয় বছর তিনি এখানে অবস্থান করেন (৪০৫ খ্রি.-৪১১খ্রি.)। তিনি ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রগুলো ঘুরে দেখার পর প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত নদী বন্দর তাম্রলিপ্তিতে আসেন। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার তমলুক হলো অতীতের সেই তাম্রলিপ্তি। এই তাম্রলিপ্তি বন্দর হতে বুদ্ধের দাঁত শ্রীলংকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যা এখনো সেখানে রয়েছে। সেই কাহিনী ‘দাঠাবংশ’-এ রচিত হয়েছে। তাম্রলিপ্তিতে ফা হিয়েন প্রায় দুই বছর অবস্থান করে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন বই এবং ছবির প্রতিলিপি তৈরি করেন। তিনি সেসময় তাম্রলিপ্তিতে বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান প্রথার অনুসারীদের আধিক্য দেখতে পেয়েছিলেন। মধ্যযুগের মহাযান সাহিত্যে একজন বাঙালী বৌদ্ধ ভিক্ষুর উল্লেখ আছে, যাঁর নাম কালিক মহাস্থবির। তিনি ছিলেন ষোলোজন মহাযান মহাস্থবিরের মধ্যে একজন।

পরবর্তী সংখ্যা পেতে চোখ রাখুন….. চলমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

No Related Post