কানা রাজার সুড়ঙ্গ : আঁধার মানিকের অজানা ইতিহাস

শিরুপন বড়ুয়া

রামুতে আলোচিত একটি দর্শনীয় স্থানের নাম “কানা রাজার সুড়ঙ্গ” বা “আঁধার মানিক”। এটি রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা নামক গ্রামে অবস্থিত। এটি একটি গুহা,যার সৃষ্টি প্রাকৃতিকভাবেও হতে পারে, নয়তো কেউ কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে এটিকে খননের মাধ্যমে তৈরি করেছিলো কয়েকশত বছর আগে।

স্থানীয়ভাবে এই গুহাটি কানা রাজার গুহা নামে পরিচিত। এই গুহার ভেতরের দেয়ালে হাতে আঁকা বুদ্ধের ছবি সহ বৌদ্ধ ধর্মীয় বিভিন্ন ছবি আছে বলে জানা যায়। কিন্তু  প্রশ্ন হলো যাঁর নামে এই গুহা,সেই  কানা রাজাটা কে?

গুগলে বাংলায় কানা রাজার গুহা লিখে সার্চ করলে বিভিন্ন লেখার সন্ধান পাওয়া যায়। যা থেকে আমরা চিন পিয়ান নামক এক ব্যাক্তির কথা জানতে পারি।

এসব লেখাতে তাঁকে কখনো আরাকানের অত্যাচারী রাজা হিসেবে, আবার কখনো বা ব্রিটিশদের কাছে রাজ্য হারিয়ে পালিয়ে বেড়ানো এক রাজা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যার কোনটাই আসলে সত্য নয়। তাহলে কিন্তু চিন পিয়ান আসলে কে?

আরাকানের ম্রোহং এ জন্ম চিন পিয়ানের পিতার নাম থানডৌ। তাঁর পিতা আরাকান রাজ্যের উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। চিন পিয়ান জন্মের ঠিক আগে তাঁর পিতা থানডৌ চিন পার্বত্য অঞ্চল থেকে সামরিক অভিযান শেষ করে আসেন।তাই তিনি তাঁর পুত্রের নাম রাখেন চিন পিয়ান।

এই “চিন পার্বত্য” অঞ্চল বর্তমান মিয়ানমারের চিন প্রদেশেই অবস্থিত। এই প্রদেশ বর্তমান রাখাইন প্রদেশের পাশেই, এবং ভারতের মনিপুর রাজ্যের  সাথে এর আন্তর্জাতিক সীমান্ত আছে।

১৭৮৪ সালের আগেও ভারত বর্ষ এবং বার্মার মাঝখানে ছোট একটি স্বাধীন রাজ্য ছিলো,যার নাম আরাকান। যার রাজধানী ম্রক উ। ১৭৮৪ সালের দিকে বর্মী রাজা বোধপায়া আরাকান দখলের জন্য অভিযানের আদেশ দেন,এবং সেই অভিযানের দায়িত্ব প্রদান করেন তাঁরই পুত্র যুবরাজ থাডো মিনসোকে।

বর্মী রাজাকে আরাকান আক্রমণের জন্য উৎসাহ দেন চিন পিয়ানের পিতা থানডৌ। বিশেষ করে ১৭৮২-১৭৮৪ পর্যন্ত আরাকান রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গে পড়ে।

সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে থানডৌ বর্মী রাজার রাজধানী অমরাপুরে গিয়ে বোধপায়াকে মিনতি করেন আরাকান আক্রমণ করতে। ম্রক উ সম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্তগামী।

বর্মী যুবরাজ থাডো মিনসো সহজেই পরাজিত করেন আরাকান অধিপতিকে। আর চিন পিয়ানের পিতা থানডৌকে আরাকানের ধান্যবতীর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়। সেই থকে স্বাধীন  আরাকান হয়ে গেলো বার্মা বা আজকের মিয়ানমারের অংশ।

কয়েক বছর পর থানডৌ নিজেই বুঝতে পারলেন তিনি খাল কেটে কুমির এনেছেন। বর্মীরা রাখাইনদের অত্যাচার করতে লগলো, এবং হাজার হাজার রাখাইন নাফ নদী পার করে ইংরেজদের শাসনাধীন এলাকা তথা টেকনাফ, উখিয়া, রামু, কক্সবাজার, হারবাং ইত্যাদি এলাকায় উদ্বাস্তু হিসেবে প্রবেশ করতে লাগলো।

এই বিশাল উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করতেই কলকাতা থেকে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে রামুতে পাঠানো হয়। পরবর্তিতে তাঁর নামেই নামকরণ হয় “কক্সবাজার”।

বর্মী রাজার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আরাকানের রাখাইনরা ১৭৯৪ সালে প্রথম বিদ্রোহ করে। তাদেরকে দক্ষিণ চট্রগ্রামের রামুসহ কক্সবাজারে আগে থেকেই উদ্বাস্তু হিসেবে আসা রাখাইনরা জনবল দিয়ে সাহায্য করে। কিন্তু ঐ বিদ্রোহে ইংরেজদের কোন সমর্থন ছিলো না।

বিদ্রোহ অসফল হওয়ার পর আরো বিপুল সংখ্যক রাখাইন বিদ্রোহী কক্সবাজার অঞ্চলে প্রবেশ করে। বর্মী রাজা বিদ্রোহীদের ফেরত চেয়ে বেশ কয়েকবার ইংরেজদের অনুরোধ করলেও, ইংরেজরা তা মেনে নেয়নি। আর এজন্য বার্মা ব্রিটিশ সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে।

এ অবস্থা নিরসনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে বোধপায়ার দরবারে ১৭৯৫ সালে ক্যাপ্টেন মাইকেল স্যামসকে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয় না।

বরং ১৭৯৮ সালে আরাকানীরা আবারো বিদ্রোহ করে বর্মী রাজার বিরুদ্ধে। তবে এবার তাদের নেতৃত্ব প্রদান করেন চিন পিয়ান। যাকে চিন বিয়ানও বলা হয়। ইংরেজদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন কিং বেরিং হিসেবে। তাঁর সাথে তাঁর পিতা থানডৌ যোগ দেন।

চিন পিয়ানের বিদ্রোহের কারণে তাঁর অপর ভাই “থেট নাম য়ুই” কে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় বর্মী রাজধানী অমরাপুরায়। থেট অমরাপুরাতেই থাকতেন, কেননা তাঁকে ১৭৮৫ সালে বর্মী যুবরাজের সহোযোগী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

১৭৯৮ সালে চিন পিয়ান বর্মী রাজ কর্তৃক পরাজিত হয়ে কয়েক হাজার অনুসারী সহ নাফ নদী পার হয়ে চট্রগ্রামের কক্সবাজার অঞ্চলে পালিয়ে আসেন উদ্বাস্তু হিসেবে। চিন পিয়ানকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আশ্রয় দেয়াটা বর্মী রাজা বোধপায়াকে ক্ষেপিয়ে তোলে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং বর্মীদের মতিগতি বোঝার জন্য কলকাতা থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে বার্মায় বোধপায়ার দরবারে প্রেরণ করা হয় ১৭৯৮ সালে। কিন্তু কোন সমঝোতা ছাড়াই হিরাম কক্স ব্যার্থ হয়ে ফিরে আসেন।

তবে তিনি বুঝতে পারেন যে, বর্মী রাজা চিন পিয়ান এবং তাঁর অনুসারীদের ফেরত দেয়ার অজুহাতে ভবিষ্যতে চট্রগ্রাম, মনিপুর, আসাম আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। হিরাম কক্স কলকাতায় ফিরে গিয়ে ইংরেজ ভাইসরয় লর্ড ওয়েলেসলিকে এ বিষয়ে অবগত করেণ।

কিন্তু ঐ সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহিশুরের বাঘ টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যাস্ত থাকায় লর্ড ওয়েলেসলি হিরাম কক্সের কথায় তেমন গুরুত্ব দেননি।

এদিকে চিন পিয়ান তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ১৮১১ সালে নাফ নদী অতিক্রম করে আবারো আরাকান আক্রমণ করেণ। এবার আরাকানের চার জন গভর্ণর চিন পিয়ানকে রুখে দেয়। কিন্তু তারা সবাই ব্যার্থ হয়। রামাবতি এবং মঘাবতির গভর্ণরের শোচনীয় পরাজয় হয়।

এরপর চিন পিয়ান কিস্সিপা নদী তীরে জায়াবতি নামে একটি শহরের পত্তন করেন। পরে চিন পিয়ান আরাকানের বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন।

চিন পিয়ান ১৮১১ সালেই তাঁর মাতৃভূমি আরাকানের ম্রোহং থেকে বর্মী রাজার সৈন্য শিবির তছনছ করে দেন।পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে তাঁর মাতৃভূমি রক্ষায় সাহায্যের আবেদন করেন।তার বিনিময়ে আজীবন ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত থাকার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্মীরাজ বোধপায়ার সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়নি। বরং উল্টো চিন পিয়ানের মাথার দাম ঘোষণা করে তৎকালীন ৫০০০/- টাকা।

কিন্তু সেসময়ে চট্রগ্রামে অবস্থানরত ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন  হোয়াইটের মতে চট্রগ্রামের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট টি সি রবার্টসন এবং সিভিল সার্জন জন ম্যাকরে পরোক্ষভাবে চিন পিয়ানের ১৮১১ সালের আরাকান অভিযানকে সমর্থন করেছিলেন।

তবে তাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেন্ট্রাল অথরিটি’র কোন অনুমোদন ছিলো না। চিন পিয়ান খুব অল্প সময়ের জন্য আরাকানে সাফল্য পেলেও তা ধরে রাখতে পারেন নি। বর্মী রাজা বোধপায়া তার সেনা প্রধান মিন হ্লা সিথুকে প্রেরণ করেন চিন পিয়ানকে দমন করতে।

চিন পিয়ান পরাজিত হয়ে আবারো আরাকান থেকে বিতাড়িত হন, রামুসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করেন। চিন পিয়ান ব্রিটিশ শাসনাধীন এলাকায় আত্মগোপন করাতে বর্মী রাজা আবারো ব্রিটিশ সরকারের উপর ক্ষেপে যান। চিন পিয়ান কে ফিরিয়ে না দিলে বাংলা আক্রমণ করার হুমকি দেন।

১৮১৪ সালের দিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিস্থিতি শান্ত করতে বর্মী রাজাকে নাফ নদী পার করে কক্সবাজারে এসে চিন পিয়ানকে ধরার অনুমতি প্রদান করে ।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আরাকানের দেশপ্রেমিক যোদ্ধা চিন পিয়ান ১৮১৫ সালে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় অসুস্থতায় মারা যান ।

সতেরো বছর চিন পিয়ান তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি আরাকানের জন্য লড়ে যান। কিন্তু যোগ্য সহযোদ্ধার অভাবে তিনি আরাকানকে স্বাধীন করতে ব্যার্থ হন।

চিন পিয়ানকে যদি ব্রিটিশরা সহযোগীতা করতো তাঁর মাতৃভূমিকে বর্মী রাজার হাত থেকে স্বাধীন করতে,তবে হয়তো আজ আরাকান একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিতো। বর্তমানে যে রোহিঙ্গা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে,তাও হয়তো হতো না।

কারণ আরাকানের সাথে বর্মীদের যুদ্ধটা বৌদ্ধ আর মুসলমানদের মধ্যে ছিলো না, ছিলো বর্মীদের বিরুদ্ধে রাখাইনদের যুদ্ধ। মুসলমান এবং রাখাইনরা সেসময়ের আরাকানে শান্তিপূর্ণভাবেই অবস্থান করতো।

সেসময়ে সংখ্যালঘু মুসলমানদের আরাকানে নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাস নেই। কেননা  আরাকানিজরা তখন সম্মিলিত ভাবে বর্মীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলো।

খোদ ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং লেখক Arthur Phayre তাঁর Eastern Frontier বইয়ের ১৪৮ নং পৃষ্ঠায় চিন পিয়ানের মতো দেশপ্রেমিককে সহযোগিতা না করার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সরকারকে দায়ী করেন।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃক ২০১৮ সালে প্রকাশিত এবং মুফিদুল হক কর্তৃক সম্পাদিত বই “Rohingya Genocide” এর ৬৭ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে “The conflict in Arakan at that time was not of Buddhists versus Muslims, rather it was conflict between two kingdoms and two nations.”

একই পৃষ্ঠায় আরো বলা হয়েছে এই চিন পিয়ানই হলেন কানা রাজা বা One Eyed King,যাঁর মৃত্যুর পর রামু’র স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আঁধার মানিক বা কানা রাজা  গুহার আশেপাশেই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

পরবর্তিতে ১৮২৪ সালে বোধপায়ার উত্তরসূরি বাগিদো ইংরেজ কর্তৃক আরাকানীজ বিদ্রোহীদের চট্রগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় দেয়ার অজুহাত দেখিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন। হিরাম কক্সের অনুমান সত্য হয়।

সেই অভিযানে বার্মীরাজের পক্ষে বিখ্যাত সেনাপতি মহা বান্ডুলা নেতৃত্ব দেন। মহা বান্ডুলা প্রথমে উখিয়ার রত্না পালং জয় করেন, এবং পরে রামুতে ইংরেজদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।

ইতিহাসে এটা “দ্যা ব্যাটল অফ রামু” নামেই পরিচিত।

ব্যাটল অব রামু হলো সেই বিখ্যাত যুদ্ধ যা পরবর্তিতে প্রথম এ্যাংলো-বার্মিজ ওয়ারে রুপ নেয়। আরো পরে ব্রিটিশরা বার্মা দখল করে নেয়। সে এক অন্য ইতিহাস।

তথ্যসূত্র :

1. Manusya, Journal of Humanities Regular, 18.02.2015, Page : 58.

2. Burma, D G E Hall, Hutchinson’s University Library, London, 1950, Page : 82

3. Paton. Historical & Statistical Sketch of Arakan, Page : 367.

4. Naming A People : BRITISH  FRONTIER MANAGEMENT IN  EASTERN  BENGAL AND   THE ETHNIC CATEGORIES OF  THE  KUKI-CHIN : 1760-1860, Soong Chul Ro, University of Hull, May 2007, Page : 130.

5. Captain  W.  White,  A  Political  History  of the  Extraordinary  Events  which  Led  to  the  Burmese  War, London : C.  Hamilton,  1825 page : 15-6.

6. History of Burma, G E Hurvey, Page : 282-283.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *