রামু ‘রামকোটের’ প্রাচীনত্ব ও ইতিহাস

রামু’র প্রাচীনত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে রামকোট এর উপর। কিন্তু রামকোট এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ না করার কারণে অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে। রামু’র ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রামকোটের পাহাড়ি জঙ্গলে।

শিরুপন বড়ুয়া

রামকোট রামু উপজেলার সবচেয়ে প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে খ্যাত। এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। ধর্মীয় দিক থেকে এটি হিন্দু এবং বৌদ্ধদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বিষয়ে বিশদভাবে আলোচনা করার দরকার আছে।

রামু’র প্রাচীনত্ব এই রামকোটের মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। অনেক ঐতিহাসিক রহস্য এবং প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এখানে। এখানকার ছোট ছোট টিলাগুলোতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রাচীন ইট এবং নানান ধরণের প্রাচীন অবকাঠামোর চিহ্ন। এই রামকোটকে প্রাচীন আমলের হরিকেল রাজ্যের অংশ বলে মনে করা হয়। যদিও একটা সময় শুধু সিলেট বিভাগকে মনে করা হতো হরিকেল রাজ্য, কিন্তু বর্তমানে সেই ধারণা পাল্টে গেছে।

দেবাতিদেব, কান্তিদেব এবং অট্টকরাদেব এই তিনজন বৌদ্ধ রাজা চট্টগ্রামে রাজত্ব করতেন বলে জানা যায়। এঁদের মধ্যে দেবাতিদেব রাজত্ব করতেন ৭ম শতকের মাঝামাঝি সময়ে। এই সময়ে অর্থাৎ ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দের একটি তামার ফুলদানিতে রাজা দেবাতিদেব দ্বারা হরিকেলিয়াম সম্প্রদায়ের জন্য একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণের জায়গা দান করার কথা উল্লেখ আছে। এখানে হরিকেলিয়াম হচ্ছে হরিকেল রাজ্যের জনগোষ্ঠী। ঐ ফুলদানিটি চট্রগ্রামে আবিস্কৃত হয় যা বর্তমানে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

চট্টগ্রামে নাসিরাবাদের একটি বৌদ্ধ বিহার থেকে হরিকেল রাজ্যের রাজা কান্তিদেবের একটি তাম্রলিপি উদ্ধারের পর এখন এটা নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে চট্টগ্রাম একসময় হরিকেল রাজ্যের অংশ ছিল। চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে মাটির পাত্রে বেশ কিছু হরিকেল মুদ্রার সাথে আরাকান রাজার মুদ্রাও আবিস্কৃত হয়েছে, এবং ঐসব হরিকেল মুদ্রার সাথে আরাকানি মুদ্রার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যমতে রামু’র রামকোট ছিল প্রাচীন হরিকেল রাজ্যের একটি অংশ।

ছবি: রামকোট এলাকার প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন।

রামুতে বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু হিউয়েন সাং এসেছিলেন কিনা তার উপর রামু’র প্রাচীনত্ব কিছুটা হলেও নির্ভর করে। বিশেষ করে স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং লেখকগণ তাঁদের লেখায় রামুতে হিউয়েন সাং এসেছিলেন, এবং রামকোটে মৌর্য্য সম্রাট অশোক নির্মিত বৌদ্ধ স্তুপ দেখতে পেয়েছিলেন, এই বিষয়টা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।

সে হিসেবে খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ সালেও রামু একটি সমৃদ্ধ নগর ছিল, তা না হলে মহামতি অশোকের মতো একজন সম্রাট রামুতে কেন বৌদ্ধ স্তুপ নির্মাণ করতে যাবেন? তারমানে হিউয়েন সাং এর ভ্রমণ বিবরণীর উপরই আমরা বিশ্বাস করছি যে, রামকোট তথা রামু যীশু খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকেই সমৃদ্ধ নগরি ছিল। শুধু তাই নয়, হিউয়েন সাং এর ধারণাকে পাকাপোক্ত করতে রামকোট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারে সম্প্রতি হিউয়েন সাং এর একটি মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে।

হিউয়েন সাং এর রামু ভ্রমণের বিষয়টি অনেকটা জোর দিয়েই বলেছেন শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো তাঁর রচিত ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে রাং-উ রাংকূট’ গ্রন্থে। উক্ত গ্রন্থটিতে তিনি শ্রী প্রেমময় দাসগুপ্তের লেখা ‘হিউয়েন সাং এর দেখা ভারত’ গ্রন্থটির উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, হিউয়েন সাং এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত অনুযায়ী রামুর রামকোট খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকেরও আগের বলে প্রতীয়মান হয় (পৃ: ১০)

তাহলে হিউয়েন সাং রামুতে এসেছিলেন কিনা, আগে সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা দরকার।

হিউয়েন সাং তাঁর ভারত ভ্রমণে যা কিছু দেখেছেন, তার সবই ভ্রমণ বৃত্তান্ত হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গসহ বাংলাদেশের কিছু অংশে ভ্রমণ করেছিলেন। বাংলার সমৃদ্ধ জনপদ পুন্ড্রবর্ধন ভ্রমণ করার সময় সেখানে তিনি সম্রাট অশোক নির্মিত বৌদ্ধ স্তুপ দেখতে পান।

ছবি: থাইল্যান্ডের থ্যাট ফানম চৈত্য। বুদ্ধের বক্ষাস্থি সংরক্ষিত আছে বলে মনে করা হয়।

কানিংহাম মনে করেন, এই পুন্ড্রবর্ধন হচ্ছে আজকের পাবনা, কিন্তু ইতিহাসবিদ ফার্গুসন সেটাকে মনে করেন রংপুর। হিউয়েন সাং এরপর পূর্বদিকে যাত্রা করে কামরুপ পৌঁছান। সে সময় কামরুপের রাজা ছিলেন কুমার ভাস্করবর্মা। হিউয়েন সাং কামরুপ রাজ্যে কোন বৌদ্ধ বিহার দেখতে পান নি। কেননা তাঁর মতে কামরুপের মানুষজন দেবতা পূজারী এবং তারা বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী নয়।

ইতিহাসবিদদের মতে আজকের আসামের পশ্চিমাংশই হচ্ছে কামরুপ। তিনি এর পর কামরুপ থেকে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করে সমতট নামক দেশে পৌঁছান। কানিংহাম এর মতে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ নিয়ে সমতট রাজ্য, যার প্রধান শহর আজকের যশোর।

অন্যদিকে ফার্গুসন মনে করেন ঢাকা এবং সোনারগাঁও এলাকা নিয়েই ছিল সমতট। এছাড়া ফরিদপুরকেও মনে করা হয় সমতটের অংশ। উল্লেখ্য যে, এসব এলাকার বেশিরভাগই সমতল। হয়তো একারণে এর নাম সমতট। কিন্তু শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো কিভাবে চট্টগ্রাম এবং রামু’র মত পাহাড়ি এলাকাকে হিউয়েন সাং এর দেখা সমতট বলে দাবি করেছেন, সেটা আমার কাছে বোধগম্য হয় নি।

যাই হোক, হিউয়েন সাং সমতটে বেশ কিছু বৌদ্ধ বিহার এবং এর রাজধানীর কাছে সম্রাট অশোক নির্মিত একটি বৌদ্ধ স্তুপের দেখা পেয়েছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার নামটি এসেছে ধর্মরাজিক থেকে, যা ছিল সম্রাট অশোক নির্মিত সেই বৌদ্ধ স্তুপ।

ছবি: লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনে অবস্থিত ফ্রা থ্যাট লুয়াং চৈত্য। বুদ্ধের বক্ষাস্থি সংরক্ষিত আছে বলে মনে করা হয়।

জতিন্দ্র মোহন রায় তাঁর ‘ঢাকার ইতিহাস ‘ (২য় খন্ড, পৃ: ২২) গ্রন্থে ধামরাইকে ধর্মরাজিকা হিসেবে উল্লেখ করেছে। হিউয়েন সাং তাঁর বিবরণীতে সমতটের রাজা রাজভট্র বলে উল্লেখ করেন। এদিকে বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে হিউয়েন সাং এর দেখা অশোকের বৌদ্ধ স্তুপটি কুমিল্লার কাছাকাছি কোথাও হবে।

হিউয়েন সাং সমতট থেকে পশ্চিমে তাম্রলিপি গিয়েছিলেন। তাঁর  ভ্রমণ বৃত্তান্তে এটা স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, এই সমতটের পর দক্ষিণে আরও ছয়টি দেশ আছে, যা তিনি ভ্রমণ করেননি। সেই দেশগুলোর মধ্যে শীক্ষেত্র হচ্ছে আজকের ত্রিপুরা। এরপরের রাজ্য কমলঙ্কা, যা চৈনিক পরিব্রাজক ইৎসিং এর মতে  পেগু।

কিন্তু শ্রী কালী প্রসন্ন সেন সম্পাদিত ত্রিপুরা রাজ্যের ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ ‘শ্রী রাজমালা’ থেকে জানা যায় কমলঙ্কা হচ্ছে আজকের কুমিল্লা। (পৃ: ৮৭, রাজমালা)। এই দুটি দেশসহ শ্যাম অর্থাৎ থাইল্যান্ড, জাভা, কম্বোডিয়া এবং কোচিন, মোট ছয়টি দেশে হিউয়েন সাং ভ্রমণ করেননি। তাঁর ভ্রমণকাহিনী লেখা হয়েছিল চীনা ভাষায়।

চীনা ভাষা থেকে যে কয়জন প্রথম দিকে সেই ভ্রমণ বৃত্তান্ত ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন তাঁদের মধ্যে Thomas Watters এর ‘On Yuan Chawng’s travels in India’ গ্রন্থটিকেই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন T.W Rhys Davids. কেননা Mr. Watters পালি, সংস্কৃতি এবং চীনা ভাষায় যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন।

এছাড়াও বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় যে, হিউয়েন সাং অতিমাত্রায় দুর্গমতার জন্য সমতটের পর আরও দক্ষিণে ভ্রমণ করেন নি। তার মানে তিনি আদৌ চট্টগ্রাম এবং রামুতে আসেন নি। যদি তিনি এই অঞ্চলে আসতেন, তাহলে অবশ্যই তাঁর নিজের ভ্রমণ বৃত্তান্ত ছাড়াও পরবর্তী সময়ে চৈনিক বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং পরিব্রাজকদের ভ্রমণ বৃত্তান্তে সেটা উল্লেখ থাকতো। হিউয়েন সাং এর কিছু বছর পর ভারতবর্ষে আসা আরেক বৌদ্ধ ভিক্ষু ইৎ সিঙ এর বর্ণনায় হরিকেল রাজ্য সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

তিনি ৬৭৩ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করেন। ইৎ সিঙ ভারত ভ্রমণের সময় নালন্দায় নিজ দেশের আরেক বৌদ্ধ ভিক্ষু ওয়ো হিং (Wou Hing) এর দেখা পান ।

ইৎ সিঙ তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে বলেন যে  ওয়ো হিং ৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সমুদ্রপথে আজকের শ্রীলংকা হতে হরিকেল রাজ্যে এসেছিলেন। এটা প্রমাণ করে যে, প্রাচীন হরিকেল রাজ্য সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত ছিল এবং এই রাজ্যে সমুদ্র বন্দরও ছিল। ইৎ সিঙ এর মতে এই হরিকেল রাজ্য ছিল পূর্ব ভারতের পূর্ব সীমানায়। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে ইৎ সিঙ বর্তমানের নোয়াখালী এবং কুমিল্লার পূর্বে হরিকেল রাজ্যের অবস্থান বুঝিয়ে ছিলেন। আরেক চৈনিক বৌদ্ধ ভিক্ষু হু লিন (Hu Lin A.D 817) এর বিবরণী মতে সমতট, হরিকেল এবং তাম্রলিপ্ত ছিল কামরুপের প্রতিবেশী।

অষ্টম শতাব্দীর একটি বই ‘আর্য মঞ্জুশ্রী মূলকল্প” এর বর্ণনা মতে সমতট, বংগ এবং হরিকেল ছিল তিনটি পৃথক স্বতন্ত্র দেশ। এসব বিবরণী হতে এটা সুস্পষ্ট যে, ৭ম শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী  এলাকা হরিকেল পৃথক একটি স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল। ইৎ সিঙ, ওয়ো হিং এবং হু লিন এঁদের কারো ভ্রমণ বৃত্তান্তে হরিকেল রাজ্যে সম্রাট অশোক নির্মিত কোন বৌদ্ধ স্তুপের কথা উল্লেখ নেই। তাই এটা অনেকটাই নিশ্চিত যে, চট্টগ্রাম এবং রামু যদি হরিকেল রাজ্যের অংশ হয়, তবে এই এলাকায় সম্রাট অশোক নির্মিত কোন বৌদ্ধ স্তুপ কখনই ছিল না। তাছাড়া ইৎ সিঙ এর মতে হরিকেল যদি পূর্ব ভারতের পূর্ব সীমানার রাজ্য হয়, তবে এই রাজ্যের সীমানা পূর্বে ত্রিপুরা এবং দক্ষিণ পূর্বে সর্বোচ্চ বর্তমানে আরাকানের কিছু অংশ পর্যন্ত হতে পারে।

তা না হলেও আরাকান হরিকেল রাজ্য দ্বারা যে প্রভাবিত ছিল তা আরাকানী মুদ্রা দেখে সহজে বোধগম্য হয়। সুতরাং শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর দাবিমতে চট্টগ্রাম এবং রামু যদি সমতট হয়, তাহলে হরিকেল হবে ত্রিপুরার আরও পূর্বে অথবা আরাকানের আরো দক্ষিণ-পূর্বে, যা ভারতবর্ষের বাইরে। কিন্তু তা একেবারেই অসম্ভব।

আসলে মৌর্য্য সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল দ্বারা রামু’র প্রাচীনত্ব নির্ধারণ করা যাবে না। রামুর প্রাচীনত্ব নির্ণয় করতে গেলে এই অঞ্চলের নিজস্ব ইতিহাসের উপর জোর দিতে হবে। এবিষয়টি পাঠকদের কাছে আরও সুস্পষ্ট করতে রামকোট সম্পর্কে শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো’র লেখা ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে রাং-উ রাংকূট’ গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

গ্রন্থের লেখক ‘রামু’ শব্দের উৎপত্তি এবং ‘রাংকূট’ কিভাবে ‘রামকোট’ হয়ে গেল তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর বক্তব্য জোরালোভাবে দাঁড় করানোর জন্য কিছু যুক্তিও দেখিয়েছেন।

লেখকের মতে, ‘রাংউ’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ‘রামু’ হয় (পৃ: ২৩)। তিনি আরো বলেন,’রাং’ একটি আরাকান ভাষাজাত শব্দ, যার অর্থ বুকের হাঁড় বা বক্ষাস্থি, এবং’ উ’ অক্ষরটি আরাকানীরা ব্যবহার করে থাকেন কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর জন্য। উদাহরণস্বরূপ তিনি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ‘উ থানট’ এর কথা উল্লেখ করেন। হ্যা, এটা সত্য যে সম্মান দেখানোর জন্য বাঙলায় আমরা যেমন শ্রী, জনাব, শ্রদ্ধেয় শব্দগুলো ব্যবহার করে থাকি, তদ্রুপ রাখাইনদের মধ্যেও সম্মান জানাতে নামের আগে ‘উ’ ব্যবহৃত হয়। যেমন, উ খিজারী।

এখন লেখকের মতে, বুদ্ধের বুকের হাঁড় বা বক্ষাস্থি অর্থাৎ ‘রাং’ বুদ্ধ মূর্তির মস্তকে স্থাপনের মাধ্যমে প্রাচীন রম্যবতি নগর হয়ে গেল ‘রাং-উ’ যা আরও বহু বছর পরে হয়ে যায় ‘রামু’।

বেশ ভালো একখানা যুক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সম্মান জানাতে গিয়ে ‘উ’ অক্ষরটি ‘রাং’ শব্দের পেছনে গিয়ে বসলো কোন যুক্তিতে? লেখকের নিজের দেয়া উদাহরণ অনুযায়ী সেটা হওয়ার দরকার ছিল ‘উ রাং’। তা না হয়ে হলো রাং উ। রামু শব্দের আদিরুপ হিসেবে প্রমান করতেই কি এমনটা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে?

যদি ‘উ’ অক্ষরটি বুদ্ধের বুকের অস্থি ‘রাং’ শব্দটিকে সম্মান জানাতে তার আগে বসানো হয়, তাহলে কি হবে? অর্থাৎ লেখকের নিজের দেয়া উদাহরণ অনুযায়ী যদি আমরা ‘উ’ কে ‘রাং’ এর আগে বসিয়ে ‘উ রাং’ বা ‘উরাং’ লিখি, তবে এর কি কোন অর্থ হয়?

মজার বিষয় হচ্ছে, পালি ভাষায় বুকের হাঁড় বা বক্ষাস্থির নাম হচ্ছে ‘উর’। সে হিসেবে ‘বুকের হাঁড়’ হবে উরঙ্গ বা উরাঙ বা উরাং। অর্থাৎ উর (বুক) এর অঙ্গ, উরঙ্গ। শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষাতেও ‘উর’ শব্দের অর্থ বুক।

এখন লেখকের যুক্তি মেনে নিলে রামুর আদিনাম রাংউ না হয়ে হওয়া উচিত ছিল উরঙ্গ বা উরাং। এমনকি সেটা হলেই বরং মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং লাওসে গৌতম বুদ্ধের বক্ষস্থি নিয়ে প্রচলিত একটি মিথ ‘Urangadhatu Chronicle’ বা ‘উরঙ্গধাতু উপখ্যান’ এর সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এবিষয়ে একটু পর বিস্তারিত বলছি। যাই হোক, গ্রন্থটির লেখকের দাবি মতে রাংকূট কে ইচ্ছাকৃত ভাবে রামকোট বানানোর বিষয়টিও আসলে কোনভাবেই যৌক্তিক নয়।

এটা ঐতিহাসিকভাবেই প্রমানিত যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে হিন্দু এবং বৌদ্ধ রাজ পরিবার দ্বারা শাসিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতের সাথে ব্যপক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের কারণে এসব দেশের সংস্কৃতিতে ভারতীয় প্রভাব বেশ ভালোভাবেই লক্ষণীয়। যেমন,  থাইল্যান্ডের অন্য নাম সুবর্ণভূমি, মালয়েশিয়ার একটি জায়গার নাম পুত্রজায়া, সুমাত্রা নামটি এসেছে সমুদ্র থেকে, মিয়ানমারের প্রাচীন কিছু নগরের নাম বৈশালী, রম্যবতি,ধন্যবতি ইত্যাদি।

ঠিক একইভাবে রামকোটের নামটিতে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব আছে। কোট শব্দটির অর্থ দুর্গ। কিন্তু তাই বলে আবার রামকোট রামের কোট বা রামের দুর্গ ভাবার কোন কারণ নেই।

লেখক প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো’র যুক্তি হচ্ছে, ব্রিটিশ আমলে (১৯৩৩ সালে) হিন্দু RS জরিপ কর্মকর্তা কমিশনার G.K Bose এর আর্শীবাদে রাংকূট হয়ে গেল রামকোট, এবং রাংউ হয়ে গেল রামু। লেখক এখানে প্রতক্ষ্যভাবে  হিন্দুদের প্রতি উক্ত কমিশনারের পক্ষপাতের বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি এটা খেয়াল করেন নি যে ব্রিটিশদের বহু আগে ১৫৮৩ থেকে ১৫৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ভ্রমণ করা রালফ ফিচ রামুকে কিংডম অব রামে ( Kingdom of Rame) বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি কিংডম অব রাংউ লেখেন নি। অথচ তখন কিন্তু রামুতে ছিল বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী আরাকানীদের শাসন।

রামু’র নাম যদি সত্যিই রাংউ হতো, তবে সেটা আরাকানীরা অবশ্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করতো। ইউরোপিয়ান পাদ্রী সেবাস্তিয়ান ম্যানরিক ১৬৩০ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই জুলাই রামু আসেন। তাঁর মতে রামু’র আরাকানি শাসককে বলা হত  পোমাজা (Pomaja)। এই Pomaja শব্দটি এসেছে আরাকানী Panwa sa  (Ramu sa) থেকে।

রামু’র আদিনাম যদি রাং উ হতো তাহলে রামুর শাসককে ম্যানরিক রাং উ সা ( Rang U sa)  বলে উল্লেখ করতেন, এবং  সেটা আরাকান আমলে হওয়াটাই বেশি যৌক্তিক। কিন্তু  সেটা হয়নি। বরং ইতিহাসে দেখা যায় দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে রামুকে Rame, Rama, Ramoo এমন কি ১০০-১৫০ খ্রিষ্টাব্দে টলেমি’র মানচিত্রেও রাং উ নামে কোন জায়গার উল্লেখ নেই। অথচ লেখক প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো এবং রামকোট বিহার কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যমতে বুদ্ধের বক্ষস্থি রামুতে স্থাপিত হয়েছে  ২৬৮ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে। সে হিসেবে রাং বা বক্ষাস্থি স্থাপনের কারণে রামু’র নাম টলেমির মানচিত্রে রাং উ হিসেবে থাকা উচিত ছিল।

যদি তাই হতো, তবে রামুতে আসা রালফ ফিচসহ, ম্যানরিক, এবং তারও পরে রেনেল, বুকানন এঁদের লেখাতে ‘রাং উ’ শব্দটি আমরা পেতাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই, রামু’র আদিনাম হিসেবে ‘রাং উ’ এর ব্যবহার তাঁদের লেখা তো বটেই, অন্যকোন ইতিহাসবিদদের লেখাতেও চোখে পড়ে না। এমনকি মধ্যযুগে অঙ্কিত দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রেও ‘রাং উ’ এর নাম চোখে পড়ে না, বরং রামু’র নাম ‘রামু’ হিসেবেই দেখানো হয়েছে।  ব্রিটিশ আমলে আরাকানি কিছু নথিপত্রে রামু’র নাম প্যনওয়া বা প্যনোয়া (Panwa) হিসেবে দেখা যায়।

একটু আগে ‘Urangadhatu Chronicle’ বা ‘উরঙ্গধাতু’ উপখ্যান নিয়ে কথা বলছিলাম, যা গৌতম বুদ্ধের বক্ষস্থি নিয়ে প্রচলিত দক্ষিণ এশিয়ার একটি মিথ। এই ‘উরঙ্গধাতু’ কাহিনীর মধ্যে দেশ ভিত্তিক ভিন্নতা থাকলেও একটা জায়গায় কিন্তু খুব মিল। সেটা হচ্ছে, তথাগত বুদ্ধ একবার ভারতের বাইরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এসেছিলেন এবং মেকং নদীর তীরে বসে আনন্দকে নতুবা মাহাকাশ্যপকে বলেন যে, ভবিষ্যতে এই দেশে একটি পর্বতের চূড়ায় তাঁর বক্ষাস্থি স্থাপিত হবে। বলে রাখি যে, এই মেকং নদী মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং লাওস এই তিন  দেশের উপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে।

‘উরঙ্গধাতু’ উপখ্যানে উল্লেখিত একটি জায়গা হচ্ছে উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের ফু কামফ্রা পাহাড়ি এলাকা। ‘The That Phanom Chronicle’ (থ্যাট ফানম ক্রনিকল) গ্রন্থে বলা হয়েছে, গৌতম বুদ্ধ এই পার্বত্য এলাকায় উপস্থিত হওয়ার পর তাঁর শিষ্য মহাকাশ্যপকে পালি ভাষায় বলছেন, ” উরঙ্গধাতু, কাশ্যপা কাপানাগিরি আপাত্তাতা”।

এটা বলার পর তথাগত বুদ্ধ ফু কামফ্রা পাহাড়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে মহাকাশ্যপকে আবারো বললেন  “কাশ্যপ, আমার পরিনির্বাণের পর তুমি আমার বক্ষাস্থি ফু কামফ্রাতে নিয়ে আসবে। আমি যা বলেছি তা তুমি ভুলে যেও না”। কথাগুলো বলার সময় অগ্রসেবক আনন্দ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর বক্ষাস্থি থাইল্যান্ডের ফু কামফ্রা পাহাড়ি এলাকার ফ্রা থ্যাট ফানম চৈত্যে বা স্তুপে সংরক্ষণ করা হয় বলে অনুমান করা হয়। তবে থাইল্যান্ডের থ্যাট ফানম চৈত্যটি মধ্যযুগে নির্মিত হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে প্রমানিত হয়েছে।

একই গল্প থাইল্যান্ডের পাশের দেশ লাওসেও চালু আছে। লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনে অবস্থিত ফ্রা থ্যাট লুয়াং স্তুপে বুদ্ধের বক্ষাস্থি আছে বলে মনে করা হয়। লাওসের উরঙ্গধাতু উপখ্যান মতে ঐ স্তুপটি ভারতে সম্রাট অশোকের রাজত্বের সময় তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এবং গবেষণায় এটা প্রমানিত হয়েছে যে, এই ফ্রা থ্যাট লুয়াং স্তুপটি ১৫৬৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা জয়াজেত্তাধীরাজা’র সময়ে নির্মিত হয়।

এই উরঙ্গধাতু কাহিনী’র উপর থাইল্যান্ডের Khon Kaen University এর  Fine Arts and Applied Arts ফ্যাকাল্টি একটি গবেষণা চালায়। গবেষণাপত্রটি ২০১৮ সালে প্রকাশ করে Medwell Journal। এই গবেষণাপত্রে বলা হয়, মেকং নদীর অববাহিকার জনজীবন অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছে বুদ্ধের বক্ষাস্থি নির্ভর কাহিনী উরঙ্গধাতু উপখ্যান দ্বারা।

এই গল্পটির লেখক হলেন ফ্রায়া চম্ফু, যিনি ছিলেন লাওসের ল্যান চ্যাং বংশের শাসনামলের রাজা সুর্যবংশের অধীনে একজন রাজ কর্মচারী। রাজার আদেশে তাঁর শাসনামলেই (১৬৩৭ খ্রিঃ-১৬৯৪ খ্রিঃ) উরঙ্গধাতু উপখ্যানটি লেখা হয়। ফ্রায়া চম্ফু বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন সাহিত্যের উপর নির্ভর করে এই উপখ্যানটি লিখলেও গবেষকরা এটাকে নিছক গল্পই বলেছেন, যার কোন ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। কারণ গৌতম বুদ্ধ ভারতের বাইরে, বিশেষ করে উত্তর ভারতের বাইরে অন্য কোথাও গিয়েছিলেন মর্মে ঐতিহাসিক কোন প্রমান এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

বুদ্ধের বক্ষাস্থি নিয়ে এই একই গল্প রামু’র রামকোটকে ঘিরে কখন তৈরি হলো? কেননা এখানেও দেখা যাচ্ছে গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্য আনন্দকে বলছেন, ভবিষ্যতে পশ্চিম সাগরের পূর্ব তীরে পাহাড়ের চূড়ায় তাঁর বক্ষাস্থির উপর স্তুপ বা চৈত্য নির্মাণ করা হবে।

অনেক ইতিহাসবিদ এটা মনে করেন যে, প্রাচীনকালে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা তথা চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ রামু’র সাথে ‘মন’ নামে এক জাতির মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই ‘মন’ জাতি প্রথমে মেকং নদীর অববাহিকায় বসতি গড়েছিল। পরবর্তীতে গৌতম বুদ্ধের জীবদ্বশায় তাদের প্রথম শাসক ‘সিহরাজা’র নেতৃত্বে বর্তমানের মিয়ানমার থাইল্যান্ড সীমান্তে একটি রাজ্য গড়ে তোলে যার নাম ‘সুবর্ণভূমি’। প্রাচীন কিছু ইউরোপীয় মানচিত্রে এই সুবর্ণভূমির অবস্থান বর্তমানের মিয়ানমার এবং থাইল্যন্ডের মাঝামাঝি স্থানে দেখানো হয়েছে।

ঐসব মানচিত্রে আজকের আরাকান পরিচিত ছিল ‘রৌপ্য রাজ্য’ বা ‘Kingdom of Silver’ নামে, এবং এর পরেই ‘Kingdom of Gold’ বা ‘সুবর্ণভূমি’র অবস্থান। সেই হিসেবে প্রচীনকালে আজকের মিয়ানমারের নিম্নাংশে ‘মন’ জাতির একটি রাজ্য ছিল এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ‘মন’ জাতির সুবর্ণভূমি পরবর্তীতে পরিচিতি লাভ করে ‘রমন্নাদেশা’ বা ‘রমন্না’ নামে।

বর্তমানে এটি মিয়ানমারের Mon State নামে পরিচিত, এবং থাটন হচ্ছে এই ‘মন’ প্রদেশের একটি সমুদ্র বন্দর। এই সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে ‘মন’ জাতি ভারত এবং শ্রীলংকাসহ চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। তাই এই ‘মন’ প্রদেশ থেকে মেকং নদীর অববাহিকায় প্রচলিত বুদ্ধের বক্ষাস্থির গল্প শ্রীলংকাসহ ভারত তথা এই অঞ্চলেও প্রবেশ করতে পারে, সেটা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ ব্যবসা বাণিজ্য এবং বণিকদের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান বেশি হয়।

‘মন’ জাতির ‘রমন্নাদেশা’র একটি কালচারাল আউটপোস্ট মনে করা হয় রামুকে। সেই সূত্র ধরে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থিকে কেন্দ্র করে মেকং নদীর অববাহিকায় সৃষ্ট হওয়া ‘উরঙ্গধাতু উপখ্যানটি’ চট্টগ্রামের রামুতে প্রবেশ করতেই পারে। অনেকটা প্রবরণা পূর্ণিমার সময় বাঁকাখালী নদীতে জাহাজ ভাসানো উৎসবের মতো, যেটা আমাদের রামুতে এসেছে পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে।

এই ‘মন’  প্রদেশ (Mon State) যার আদিনাম রমন্নাদেশা বা রমন্না হতে উৎপত্তি হয় ‘রমন্না নিকায়’। যা ২০১৯ সালের আগেও শ্রীলংকার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিনটি প্রধান নিকায় বা দলের একটি ছিল। এই শ্রীলংকা থেকেই রামু রামকোটে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধেয় জগতচন্দ্র মহাস্থবির প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে বড় বুদ্ধ মূর্তিটি আবিস্কার করেন, যা স্থানীয়ভাবে বুড়োগোসাঁই নামে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হয় ঐ বুদ্ধ মূর্তিটির মাথায় গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি সংরক্ষিত আছে। এখন, শ্রদ্ধেয় জগতচন্দ্র মহাস্থবির যদি ভুল করে বর্তমান মিয়ানমারের ‘মন’ প্রদেশের আদিনাম রমন্নাদেশাকে আরাকানিদের ‘রম্যদেশা’ বা রামু হিসেবে মনে করেন, তবে সেটা হবে একটি ঐতিহাসিক ভুল।

রামকোট বৌদ্ধ বিহারের তোরণে এবং বিহার প্রাঙ্গণে প্রদর্শিত তথ্য বিবরণীতে দেখা যায় এই বিহারটি সম্রাট অশোক কর্তৃক ২৬৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার একই বিহারের আগের একটি তোরণে প্রতিষ্ঠার সন লেখা ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৮।

মহাবংশ এবং দিব্যদান গ্রন্থ অনুসারে অশোক সিংহাসন দখল করেন খ্রি: পূ: ২৭৪ অব্দে, এবং এর চার বছর পর খ্রি: পূ: ২৭০ অব্দে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়। তারও চার বছর পর হয় কলিঙ্গ যুদ্ধ। আমরা জানি এই যুদ্ধের পর অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। সম্রাট  অশোকের ৮ম শীলালিপি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তিনি তাঁর রাজত্বের দশম বৎসরে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। তাহলে সেটি হবে খ্রি: পূ: ২৬৪ অব্দ। এখন বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের সাথে সাথেই তো তিনি স্তুপ বা চৈত্য নির্মাণ শুরু করেননি। তাহলে ২৬৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি রাংকূট চৈত্য প্রতিষ্ঠা করেন কিভাবে? তখন তো তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণই করেননি।

শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো তাঁর ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে রাং-উ রাংকূট’ গ্রন্থটিতে দেশের খ্যতনামা ইতিহাসবিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া’র রামকোট নিয়ে গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি যা উল্লেখ করেননি তা হলো,  লেখক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া’র মতে, রামকোট বৌদ্ধ বিহারটি ভারতীয় নয় বরং আরাকানী প্রভাবে গড়ে উঠেছিল।

তবে এটি যে প্রাচীন একটি স্থাপনা, সে সম্পর্কে তিনিও একমত। (পৃ: ৭০৩, বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ)। সম্রাট অশোক কর্তৃক ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্থানে স্থাপিত বিভিন্ন বৌদ্ধ স্তুপের ছিটেফোঁটা বৈশিষ্ট রামকোট এলাকায় দেখা যায় না। এমনকি প্রাপ্ত কিছু ধ্বংসাবশেষ  থেকেও মৌর্য্য স্থাপত্যরীতি বা সেই যুগের নির্মাণশৈলির দেখা মেলে না। এটা অনেকটাই নিশ্চিত যে, চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের রামু কখনো মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অংশ ছিল না।

এ অঞ্চলে অশোকের কোন শীলালিপি আজ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি। আর নিজ সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে সম্রাট অশোক বৌদ্ধ স্তুপ নির্মাণ করেছেন, এমন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই বললেই চলে। তাই ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়া রামকোট বৌদ্ধ বিহার সম্রাট অশোক দ্বারা নির্মিত হয়েছে এরকম ভাবার চেয়ে এটি হরিকেল রাজ্যের অথবা আরাকান বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন, এই ইতিহাসই বেশি যৌক্তিক বলে মনে করছি।

লেখার শেষ পর্যায়ে রামকোটে রাম সীতা’র বিষয়টি নিয়ে অল্প কিছু কথা বলবো। কারণ এ বিষয়ে বেশি কিছু বলার মত ঐতিহাসিক উপাদান রামকোট এলাকায় এখনো আবিস্কৃত হয় নি। এখানে যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, তা বেশিরভাগই আরাকানী বৌদ্ধ সভ্যতার। তবে রামকোট অবশ্যই হিন্দু ধর্মালম্বীদের একটি পবিত্র স্থান।

হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা এটা বিশ্বাস করেন যে, বনবাসের সময় রাম সীতা এখানে এসেছিলেন। এখানে হিন্দু মন্দিরে আছে একটি প্রস্তর খন্ড, যা সীতা দেবি বনবাসের সময় মরিচ মসলা পিষতেন বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয় হিন্দুরা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়াসহ দেশের আরো কয়েকজন গবেষক প্রস্তর খন্ডটি ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন এটি কোন শিলপাটা নয়। বরং ঐ প্রস্তর খন্ডটিতে একসময় কিছু ছোট মূর্তি খোদাই করা ছিল। যা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘষে মেজে মসৃণ করা হয়েছে (বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ, পৃ, ৬৯৯)।

তাছাড়া এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাম-সীতার বনবাসের স্থান পঞ্চবটী বন ভারতের মহারাষ্ট্রে অবস্থিত। রামুতে রাম সীতার আসার কোন যৌক্তিকতাই নেই। হিন্দুরা রামুতে যেমন রামু’র রামকোটকে রামক্ষেত্র মনে করেন, ঠিক সেরকম রামক্ষেত্র ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আছে। তেমনই একটি আছে নাগপুরের একটি পর্বতে। মজার বিষয় হচ্ছে ঐ রামক্ষেত্রকেও, রামকোট, রামগিরি, রামটেক বলা হয়। (শ্রীরাজমালা, পৃ: ৮৬)।

আগেই বলেছি, রামু’র প্রাচীনত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে রামকোট এর উপর। কিন্তু রামকোট এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ না করার কারণে অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে। রামু’র ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রামকোটের পাহাড়ি জঙ্গলে।

রামু তার নিজস্ব ইতিহাস দ্বারা সমৃদ্ধ। টলেমি থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ইউরোপীয় কার্টোগ্রাফারদের আঁকা মানচিত্র বিশ্লেষণ করলেই তা বোধগম্য হবে।

(৩য় অংশে টলেমি’র মানচিত্র এবং রামু নিয়ে পড়তে চোখ রাখুন জ্ঞানান্বেষণ পাঠাগার ওয়েবজিনে)

তথ্যসূত্র:

  •   Thomas Watters edited T.W Rhys Davids, & S.W Bushell, Yuan Chang’s travels in India, Vol 2, London, 1905.
  • James B, Pruess,(Edited & translated), The That Phanom Chronicle.  Cornell University, new york 1976.
  • John S. Strong, Relics of the Buddha, Princeton University Press, New Jersey, USA,2004.
  • William J. Topich and Keith A. Leitich, The History of Myanmar, California, USA,2013.
  • India ASEAN Archaeological Atlas From Satellite Data, Government of India & Government of Thailand, 2016.
  • Nattapong Yamcharoen, The Analysis of the Vientiane’s 450-year Anniversary logo, The Asian Conference on Cultural Studies, Osaka Japan, 2013.
  • Harun or Rashid, Ancient Association Between Bengal and Thailand, Journal of Asiatic Society of Bengal, vol XIX.
  • The Antiquities of Some villages of Eastern Bengal, The Calcutta Review, vol.x.1924.
  • শ্রী কালি প্রসন্ন সেন (সম্পাদিত) শ্রী রাজমালা।
  • Radhakumud Mookerji, Asoka, London, 1928।
  • আধুনিক বাংলা অভিধান,বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
  • পালি-বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
  • Amitabha Bhattacharya,  Historical Geography of Ancient and Early Medieval Bengal, 1977, Calcutta.
  • Gouriswar Bhattacharya, Note on an Inscribed Copper Vase from the Collection of the Bangladesh National Museum, Journal of Ancient Indian History, vol xix 1989-90, Calcutta University।
  • প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো, (সংকলিত ও সম্পাদিত), ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে বাংলাদেশের প্রাচীনতম বৌদ্ধ তীর্থ রাং-উ রাংকূট।
  • Calcutta Review, Vol. X, 1924।
  • Charles Allen, Ashoka,।
  • Kanai Lal Hazra, Ashoka as Depicted in His Edicts, New Delhi, 2007.
  • Shuniti Bhushan Qanungo, A History of Chittagong,1988
  • আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ।
  • বাংলাপিডিয়া।

ছবি: ইন্টারনেট এবং লেখক।

লেখক: শিরুপন বড়ুয়া, আইনজীবী ও ইতিহাস বিশ্লেষক।

shirubarua@gmail.com

২ thoughts on “রামু ‘রামকোটের’ প্রাচীনত্ব ও ইতিহাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *